বিশেষ প্রতিনিধি::
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ড্রেজার তান্ডবে বালু লুট হওয়ায় সুনামগঞ্জের সম্ভাবনাময় সীমান্ত চেলা নদীর খনিজ বালু ‘মব’ করে লুট হয়েছে। ওই সময় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ইজারার নামে রাতদিন লুট হয় বালু। এখন বালুবিহীন এই নদীটি নিয়মিত ইজারা গেলেও নদীতে বালু না থাকায় ইজারাদারের প্রশ্রয়ে ইজারাবিহীন মরাচেলা নদীর দিকে ড্রেজারের মিছিল নিয়ে ছুটেছে বালু লুটকারীরা।
সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে যাদুকাটা নদীতে বালু আহরণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সব ড্রেজার মরাচেলা নদীতে চলে গেছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে কোম্পানিগঞ্জ থেকেও ড্রেজার এসে বালু লুট করে বদলে দিয়েছে মরাচেলা নদীর মানচিত্র। ড্রেজার তান্ডবের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে মরাচেলা নদী।
পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর শিথিলতায় যাদুকাটা, ধোপাজান, চেলা নদীতে বালু লুট হলেও পরবর্তীতে লুটকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় লুটপাট থামছেনা।
দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি বছর নদীটি ইজারা নিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। চলতি বছরও তারা ইজারা নিয়ে বালু উত্তোলন করছে। স্থানীয়রা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাজে শিথিলতা থাকায় শত শত ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে লুট করা হয়েছে চেলা নদীতে। এখন এই নদীতে কোনও বালু নেই। তাই ইজারাদারের প্রশ্রয়ে বালু লুটকারী একাধিক সিন্ডিকেট ইজারাবিহীন মরাচেলা নদীর দিকে ঝুঁকেছে। দীর্ঘদিন পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা মূল্যবান বালু জমে বিস্তৃত জমিতে রূপ নেওয়া মরাচেলা নদীতে নজর পড়েছে তাদের। এই নদীর পূর্ব সোনাপুর এলাকায় রাতে হাজারো ড্রেজার বালু উত্তোলন করছে। এই ড্রেজার পাশের কম্পানিগঞ্জ উপজেলা ও তাহিরপুরের যাদুকাটা নদী থেকেও যোগ দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বালু লুট করতে গিয়েও বিভিন্ন গ্রুপ মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে। গত ৯ জুলাই দুপুরে ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের কাজিরগাঁও এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের মধ্যবর্তী মরা চেলা সংলগ্ন কলাবাগান এলাকায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় দই পক্ষ। গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে ড্রেজার চালানো নিয়ে উত্তেজনার জেরে এক পক্ষ বালু লুটকারীদের ড্রেজার আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। গতকালও এলাকাবাসী ড্রেজারে বালু লুটকারীদের তাড়া করেছে। চলতি সপ্তাহে ইজারা বহির্ভূত এলাকায় বালু উত্তোলনে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন এলাকাবাসী। তারা বিভিন্ন সময় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেছেন। এছাড়াও রহিমেরপাড়া, সোনাপুর ও নরসিংপুরবাসী বালু লুটের তা-বে ভাঙন আতঙ্কে আছেন বলে লিখিত অভিযোগও করেছেন এলাকাবাসী। এদিকে স্থানীয় সচেতনমহল জানান, ইজারা বহির্ভূত এলাকায় বালু লুটের ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মীও জড়িত আছেন। তারা আড়াল থেকে লুটকারীদের সহযোগিতা করছেন এমন অভিযোগ আছে। লুটের বালু ছাতক হয়ে সুরমা নদী দিয়ে পাচার হচ্ছে এবং এবং এসব নৌকা থেকে বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদাও উত্তোলন করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে আকবর নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে লুটের বালু থেকে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা আদায় করা হচ্ছে।
এছাড়াও কোম্পানিগঞ্জের শওকত নামের এক ব্যক্তি লুটের বালু উত্তোলনে নিয়মিত ড্রেজার সরবরাহ করছেন বলে জানা গেছে। আকবর আলী বলেন, আমরা আমাদের ইজারাধীন এলাকা থেকে রয়্যালিটি আদায় করছি। মরাচেলা নদীতে আমরা বালু উত্তোলন করছিনা। সুনামগঞ্জ জেলা বারকি শ্রমিক সংঘের উপদেষ্টা সাইফুল আলম সদরুল বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব করে বালু লুট হয়েছে। সারাদেশবাসী দেখেছে সেটা। লুটকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় বালু লুটের এই প্রবণতা রয়ে গেছে। মরাচেলাতে তাই এখন হাজার হাজার ড্রেজারে বালু লুট হচ্ছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, চেলা নদীটি ইজারাধীন। কিন্তু মরাচেলা ইজারাধীন নয়। আমরা জানতে পেরেছি রাতে মরাচেলার পূর্ব সোনাপুর এলাকায় বালু লুট হচ্ছে। কিন্তু দুর্গম এলাকা ও রাতে লুট হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় আমরা বালু লুটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিজিবি, পুলিশ, নৌপুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছি। আগামী সপ্তাহে সবার সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
ইজারাবিহীন মরাচেলা নদীতে হাজারো ড্রেজারের তান্ডব, প্রতিদিন লুট হচ্ছে কোটি টাকার বালু
- আপলোড সময় : ০৫-১০-২০২৬ ০১:১০:১০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৫-১০-২০২৬ ০১:১৭:০২ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি